প্রকাশিত:
গতকাল

সম্প্রতি প্রথম কোনো দেশ হিসেবে সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূখণ্ড সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইসরায়েল। তেল আবিবের এ ঘোষণায় আবার সামনে এসেছে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টি।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সোমালিয়ার অখণ্ডতা নষ্ট করার যেকোনো চেষ্টা তুরস্ক সহ্য করবে না। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে তুরস্ক সোমালিয়ায় তাদের সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। তুরস্ক ও সোমালিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি অনুযায়ী, সোমালিয়ার জলসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং জলদস্যুতা রোধে তুর্কি নৌবাহিনী সরাসরি দায়িত্ব পালন করছে।
তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র। তুরস্ক মনে করে, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদ করে সোমালিল্যান্ডে পুনর্বাসিত করার ইসরায়েলি পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
হর্ন অব আফ্রিকায় আধিপত্য বিস্তারের এই লড়াই অনেক পুরোনো। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে বাণিজ্যের প্রায় ১৪ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাপী কনটেইনারনির্ভর বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ লোহিত সাগরের মধ্য দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে আসছে। এতে অঞ্চলটি ইতিমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়ন করা একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। হর্ন অব আফ্রিকায় বিশ্বের প্রায় সব কটি প্রভাবশালী দেশের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের তীর ঘেঁষে আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে হর্ন অব আফ্রিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চল বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, জ্বালানি তেলের রুট এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সোমালিয়ায় সামরিক ঘাঁটি আছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আরব আমিরাত ও তুরস্কের। সোমালিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে সামরিক স্থাপনা আছে আরব আমিরাতের। প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ডকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়ে ইসরায়েল এই ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতির পরিকল্পনা নিয়েছে।
তুরস্ক গত এক দশক ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিচ্ছে। মোগাদিশুতে তুরস্কের সবচেয়ে বড় দূতাবাস এবং একটি শক্তিশালী সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে (যা সোমালিয়ার বিচ্ছিন্ন অংশ) স্বীকৃতি দেওয়ায় তুরস্ক মনে করছে এর ফলে সোমালিয়া ভেঙে যাবে এবং ওই অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব কমে যাবে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এই স্বীকৃতিকে 'অবৈধ ও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন' বলে অভিহিত করেছেন। তুরস্ক মনে করে, ইসরায়েল এই অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করতে চায়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের দাবি, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সোমালিল্যান্ডে স্থানান্তরের একটি গোপন পরিকল্পনার বিনিময়ে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তুরস্ক এই ধরনের যেকোনো পরিকল্পনাকে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধনের অংশ হিসেবে মনে করে এবং এর তীব্র বিরোধিতা করছে।
তুরস্কের দাবি, ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিয়ে মূলত সোমালিয়ার অখণ্ডতা নষ্ট করতে চাইছে। তুরস্কের মতে, এটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের দাবিকে দুর্বল করার একটি কৌশলও হতে পারে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই পদক্ষেপকে 'অবৈধ ও অস্থিতিশীল' বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সোমালিল্যান্ডের ভৌগোলিক অবস্থান এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের প্রবেশপথে। ইসরায়েল এখানে প্রভাব খাটিয়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর নজরদারি এবং লোহিত সাগরে নিজের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে, তুরস্ক এই অঞ্চলকে তাদের আফ্রিকা নীতির ‘প্রবেশদ্বার’ মনে করে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক ও সোমালিয়া দীর্ঘদিন ধরে লাস কোরাই এলাকায় আরেকটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে। লাস কোরাই নবঘোষিত খাতুমো রাজ্যের একটি বন্দর, যেখান থেকে সরাসরি লোহিত সাগরে প্রবেশ করা যায়।
২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত মোগাদিসুতে দায়িত্ব পালন করা তুরস্কের রাষ্ট্রদূত কানি তোরুন জানান, ওই এলাকায় একটি ঘাঁটি ও কাছাকাছি ছোট বন্দর স্থাপনের বিষয়ে আঙ্কারার সঙ্গে সোমালিয়া সরকারের একটি মৌখিক চুক্তি হয়েছিল, যদিও প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ নেয়নি।
ইসরায়েল ২৬ ডিসেম্বর সোমালিল্যান্ডকে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ৩০ ডিসেম্বর আঙ্কারায় সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই স্বীকৃতিকে ‘বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে মন্তব্য করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
৬ জানুয়ারি সোমালিল্যান্ড সফরে যান ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার। রাজধানী হারগেইসায় তিনি প্রেসিডেন্ট আবদিরহমান মোহামেদ আবদুল্লাহির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ইসরায়েল চাইছে সোমালিল্যান্ডের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমাতে এবং ইরানের মিত্রদের (যেমন হুতি) মোকাবিলা করতে। অন্যদিকে তুরস্ক এই পদক্ষেপকে তাদের আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে।ইসরায়েল চাইছে নতুন মিত্র তৈরি করে তুরস্কের "আফ্রিকা নীতি" বাধাগ্রস্ত করতে, আর তুরস্ক চাইছে যেকোনো মূল্যে সোমালিয়ার অখণ্ডতা বজায় রেখে নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে।
এখন দেখার বিষয়, তুরস্ক ও ইসরায়েলের এই কূটনৈতিক লড়াই শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?