প্রকাশিত:
২ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করা অনলাইন স্ক্যাম এবং সাইবার অপরাধের সম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে বেইজিং। এরই ধারাবাহিকতায় মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ত্রাস হিসেবে পরিচিত কুখ্যাত ‘বায়’ (Bai) মাফিয়া পরিবারের আরও চার শীর্ষ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে চীন। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
চীনের গুয়াংডং প্রদেশের একটি উচ্চ আদালত প্রতারণা, ঠাণ্ডা মাথার খুন এবং অমানবিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগে এই রায় প্রদান করে। বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে কেউ পার পাবে না—বেইজিং এই কঠোর বার্তার মাধ্যমে সেটিই বুঝিয়ে দিলো।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বায়’ পরিবারটি গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে শানসি প্রদেশে একটি সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। তাদের সিন্ডিকেটটি স্থানীয় কয়লা খনিগুলোতে অবৈধ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায়ীদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালাত।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, এই পরিবারটি কেবল সাধারণ অপরাধেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তারা স্থানীয় প্রশাসনের একাংশকে ঘুষ দিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করত। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যাকাণ্ড এবং শত শত মানুষকে নির্যাতনের প্রমাণ মিলেছে।
২০২৩ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় মাফিয়াদের এই মধুচন্দ্রিমা নির্বিঘ্নে চললেও পরিস্থিতি বদলে যায় যখন বেইজিং সরাসরি হস্তক্ষেপে নাম দেয়। অনলাইন স্ক্যামে লাখো চীনা নাগরিক সর্বস্বান্ত হওয়ায় ক্ষুব্ধ চীন মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। এর ফলে বায় ও মিং পরিবারের মতো বড় বড় অপরাধী চক্রগুলোর পতন ঘটে এবং তারা চীনের হাতে ধরা পড়ে।
এর আগে গত সপ্তাহে ‘মিং’ মাফিয়া পরিবারের ১১ জন সদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এসব মাফিয়াদের অপরাধ নিয়ে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
২০২৪ সালে স্থানীয় আদালত এই পরিবারের ৪ শীর্ষ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যান্য সদস্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে। দণ্ডিতরা উচ্চ আদালতে আপিল করলেও আদালত তা খারিজ করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, "এই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার শামিল। তাই এদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শনের সুযোগ নেই।"
গতকাল বিশেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে চারজনকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চীনের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনামলে চীনে দুর্নীতি ও সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বায় পরিবারের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে সরকার দেশের অন্যান্য ছোট-বড় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে একটি কড়া বার্তা দিল। বেইজিং স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ক্ষমতার দাপট বা প্রভাব খাটিয়ে বিচার এড়ানোর সুযোগ এখন আর নেই।
জাতিসংঘের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, মিয়ানমার ও কম্বোডিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা চক্রে কাজ করতে বাধ্য করার জন্য লক্ষাধিক মানুষকে পাচার করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ চীনের সাধারণ নাগরিক, যাদের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এসব সাইবার কম্পাউন্ডে বন্দি করা হতো।
মিয়ানমার সীমান্তের এই মাফিয়া পরিবারগুলোর দম্ভ চূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনে চীনের শক্ত অবস্থান ফুটে উঠেছে। বেইজিংয়ের এই ‘আয়রন ফিস্ট’ নীতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য স্ক্যাম সেন্টারগুলোর জন্যও এক বড় সতর্কবার্তা।
এই রায় কার্যকর হওয়ার পর শানসি প্রদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের আতঙ্কের অবসান ঘটায় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা একে ‘ন্যায়বিচারের জয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক কিছু মানবাধিকার সংস্থা চীনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন তুলেছে।