প্রকাশিত:
গতকাল

গাজা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ট্রাম্পের বিশেষ শান্তি পর্ষদ (Board of Peace) ঘোষণা করেছে যে, গাজার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে হস্তান্তরের পর হামাসকে তাদের সমস্ত অস্ত্র সমর্পণের জন্য সর্বোচ্চ ৬০ দিন বা দুই মাস সময় দেওয়া হবে।
তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির বরাতে এ খবর জানা গেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, গাজার পুনর্গঠন এবং সেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তখনই সম্ভব যখন অঞ্চলটি সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ (Demilitarization) করা হবে। ট্রাম্পের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এই ৬০ দিনের মধ্যে হামাস যদি তাদের ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রকেট ভাণ্ডার জমা না দেয়, তবে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট আন্তর্জাতিক বাহিনী এবং ইসরায়েল যৌথভাবে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনা করবে।
গতকাল সোমবার স্থানীয় সংবাদপত্র মাকর রিশোনে প্রকাশিত মন্তব্যে কট্টর দক্ষিণপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী স্মোট্রিচ বলেন, ‘শান্তি পর্ষদ হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য দুই মাসের সময়সীমা বেঁধে দেবে।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামাস নিঃশেষ হওয়ার আগে গাজা উপত্যকায় যুদ্ধ বন্ধ করবে না ইসরায়েল।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ দফার শান্তি পরিকল্পনায় নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. হামাসকে তাদের সুড়ঙ্গ (Tunnel) নেটওয়ার্কের মানচিত্র হস্তান্তর করতে হবে এবং ভারী রকেট ও মিসাইল সিস্টেম আন্তর্জাতিক তদারকিতে জমা দিতে হবে।
২. গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্ব নতুন গঠিত 'ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা' (NCAG) এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনীর (ISF) কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে।
৩. সাধারণ নাগরিকদের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘গাজায় হামাসের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। আর সেটি সামরিক, বেসামরিক বা সরকারি—কোনোভাবেই নয়। আমরা অঙ্গীকার করেছি এবং এটাই যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য।’
তবে স্মোট্রিচের এ বক্তব্যের বিষয়ে ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। নেতানিয়াহু প্রশাসন এই আল্টিমেটামকে স্বাগত জানিয়েছে এবং একে গাজায় হামাসের শাসনের 'মৃত্যু পরোয়ানা' বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনের শীর্ষ নেতারা এই প্রস্তাবকে 'একপাক্ষিক' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, কোনো সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের গ্যারান্টি ছাড়া অস্ত্র ত্যাগ করা আত্মহত্যার শামিল।কাতার ও মিশর এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতা করছে, তবে তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে জোরপূর্বক নিরস্ত্রীকরণ গাজায় নতুন করে গৃহযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এ পর্ষদের সভাপতিত্ব করছেন। তাঁকে সহায়তা করছে একটি নির্বাহী পর্ষদ; যেখানে কূটনীতি, উন্নয়ন, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কৌশল বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা রয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আল্টিমেটামের মাধ্যমে হামাসকে একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছেন। যদি তারা অস্ত্র ত্যাগ করে, তবে তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে; আর যদি না করে, তবে তারা মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ সামরিক শক্তির চূড়ান্ত মোকাবিলা করবে।
সমালোচকদের মতে, এ কাঠামো প্রকৃতপক্ষে জাতিসংঘকে পাশ কাটানোরই একটি চেষ্টা মার্কিন প্রেসিডেন্টের।
এই ৬০ দিন কেবল হামাসের জন্য নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যতের জন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। ট্রাম্পের এই 'ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি ২.০' সফল হয় কি না, তা নির্ভর করছে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।