প্রকাশিত:
গতকাল

বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতি জাপানের বাজারে প্রথমবারের মতো পূর্ণাঙ্গ শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। গতকাল টোকিওতে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া ঐতিহাসিক ‘অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি’ (EPA) অনুযায়ী, মোট ৭,৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানে কোনো প্রকার শুল্ক ছাড়াই প্রবেশের সুযোগ পাবে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো উন্নত দেশের সঙ্গে করা প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও এটি। এর আওতায় তৈরি পোশাকসহ প্রায় সাত হাজার ৩৭৯টি বাংলাদেশি পণ্য জাপানের বাজারে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজারে পর্যায়ক্রমে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাবে জাপান।
এই চুক্তির ফলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ১০০ শতাংশ পণ্য রপ্তানি শুল্কমুক্ত হয়ে গেল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে:বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে পোশাক খাত এখন ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তুলনায় জাপানি বাজারে বেশি প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পাবে।বিভিন্ন ধরণের সবজি, ফল এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের জন্য জাপানের বিশাল বাজার উন্মুক্ত হলো। বাংলাদেশি জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের ওপর আগে যে চড়া শুল্ক ছিল, তা এখন শূন্যে নেমে আসবে।
কেবল পণ্য নয়, এই চুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানির বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আইটি প্রফেশনাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, নার্সিং এবং কেয়ার-গিভারসহ মোট ১৬টি সেবা খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য জাপানে কাজ করার পথ আরও সুগম করা হয়েছে।
সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে জানানো হয়, শুক্রবার জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সই করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও। অনুষ্ঠানে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান, জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী, বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনিচি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেলে অনেক দেশ থেকে বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে করা এই ‘ইপিএ’ চুক্তি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে, যা এলডিসি পরবর্তী সময়েও বহাল থাকবে।
এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশও জাপানের জন্য নির্দিষ্ট কিছু সুবিধা প্রদান করবে। মোট ১,০৩৯টি জাপানি পণ্যের ওপর থেকে ধাপে ধাপে শুল্ক কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ঢাকা। এর ফলে বাংলাদেশে জাপানি অটোমোবাইল, উন্নত যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দাম কমতে পারে এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ জাপানের জন্য ১২টি বিভাগের আওতায় ৯৮টি উপখাত উন্মুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। তবে উপখাতগুলোর নাম বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ার পাশাপাশি এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি ও লজিস্টিকস ইত্যাদি খাতে জাপানের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ সম্পর্কিত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইপিএর আওতায় কয়েক ধাপে শুল্ক ছাড় দেবে বাংলাদেশ। সর্বশেষ পর্যায়ে সব পণ্যে শুল্ক ছাড় কার্যকর হলে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই চুক্তি না হলে এলডিসি উত্তরণের পর জাপানের বাজারে শুল্ক সুবিধা হারিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি তিন হাজার কোটি টাকা থেকে তিন হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত কমে যেতে পারে। তাই সার্বিক লাভক্ষতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে শুল্ক ছাড় দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চুক্তি কেবল রপ্তানি বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশে জাপানি প্রযুক্তির প্রবেশ ত্বরান্বিত করবে। তবে তারা একইসঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যের গুণগত মান (Standardization) বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ জাপানি বাজার অত্যন্ত মান-সচেতন।
বর্তমানে এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য জাপান। দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ বছরে প্রায় ২০০ কোটি ডলার, যার বেশির ভাগই তৈরি পোশাক। অন্যদিকে গত কয়েক বছর ধরে জাপান থেকে আমদানি বছরে ১৮০ কোটি থেকে ২৭০ কোটি ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।