প্রকাশিত:
গতকাল

মধ্যপ্রাচ্যে যখন যুদ্ধের দামামা বাজছে, ঠিক তখনই এক অভাবনীয় মোড় নিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া কঠোর শর্তাবলি এবং সামরিক হুমকির মুখেও সরাসরি আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তা দিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সংকট নিরসনে ‘আরও আলোচনা’ করতে আগ্রহী এবং কূটনীতির জানালা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।
ওমানের রাজধানী মাসকাটে গত কয়েক দিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি জানান, যদিও তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবুও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তারা বার্তা আদান-প্রদান করছেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারের একটি ছোট ভিডিও ফুটেজ নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আগামী সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ধারণা করা হচ্ছে, বৈঠকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি প্রসঙ্গ তুলতে পারেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের দেওয়া ৫টি শর্ত—বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শূন্যে নামানো এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম বন্ধের দাবি—ইরানের জন্য মেনে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করার মাধ্যমে ইরান মূলত দুটি কৌশল অবলম্বন করছে: ১. নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা ২. সময়ক্ষেপণ।
এর মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার প্রধান দুই মার্কিন আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার আরব সাগরে অবস্থান করা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন পরিদর্শন করেছেন। এটাকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের হুমকির ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আল–জাজিরাকে আরাগচি বলেন, পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ইরানের ‘অখণ্ড অধিকার’ এবং এটি অবশ্যই অব্যাহত থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘এ কার্যক্রম নিয়ে একটি আশ্বস্তকারী চুক্তিতে পৌঁছাতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি।’ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দেশটির পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান শুধু আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
ইরানের এই নমনীয় মনোভাবের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বড় ভূমিকা রাখছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান পড়ে যাওয়া এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও সীমিত পরিসরে আলোচনার সবুজ সংকেত দিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের এই প্রস্তাবের পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব আসেনি। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ‘স্রেফ আলোচনার খাতিরে আলোচনা’ করতে ট্রাম্প আগ্রহী নন। তিনি চান ইরানের কাছ থেকে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি এবং পারমাণবিক কার্যক্রমের সম্পূর্ণ ইতি টানা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার জানান, ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ‘খুব ভালো আলোচনা’ করেছে। ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।এরপরও ট্রাম্প গতকাল এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন। ওই আদেশে তিনি তেহরানের জ্বালানি তেল পরিবহনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের এই আলোচনার প্রস্তাব কি কেবল একটি কৌশল, না কি সত্যিই তারা একটি বড় ধরনের সমঝোতায় আসতে চায়, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক সপ্তাহের কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। তবে যুদ্ধংদেহী মনোভাবের মাঝে এই আলোচনার বার্তা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কিছুটা হলেও প্রশান্তি এনেছে।