প্রকাশিত:
গতকাল

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো গাজাকে তিনটি পৃথক জোনে ভাগ করা এবং ভবিষ্যতে সেখানে কোনো একক ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক কর্তৃত্বকে কার্যকর হতে না দেওয়া। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি গাজাকে কার্যত একটি ‘স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে’ পরিণত করবে।
রোববার (০৮ ফেব্রুয়ারি) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী গাজাকে তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে:
১. (উত্তরের বাফার জোন) গাজা সিটির উত্তর অংশকে একটি স্থায়ী সামরিক অঞ্চলে রূপান্তর করা হবে, যেখানে বেসামরিক নাগরিকদের প্রবেশাধিকার হবে সীমিত এবং কড়া তদারকি সাপেক্ষে।
২. (নেটজারিম করিডোর) গাজার ঠিক মাঝখান দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে একটি চওড়া সামরিক রাস্তা বা ‘ করিডোর’ স্থায়ী করা হবে, যা উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখবে।
৩. (ফিলাডেলফি করিডোর) মিশর সীমান্ত সংলগ্ন এই এলাকাটি স্থায়ীভাবে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (IDF) অধীনে থাকবে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজার ভেতরে একটি নতুন সীমানা রেখা তৈরি করেছে যা ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত। এই পরিকল্পনায় মানবিক সহায়তার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে রাখার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো ত্রাণসামগ্রীর ওপর হামাসের প্রভাব সম্পূর্ণ নির্মূল করা। তবে জাতিসংঘ সতর্ক করেছে যে, সামরিক বাহিনীর হাতে ত্রাণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি বাড়বে।
মন্ত্রিসভায় পাস হওয়া দলিলে গাজার অভ্যন্তরে স্থায়ীভাবে কংক্রিটের টাওয়ার, সেন্সর এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রিত পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কট্টরপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, "গাজায় নিরাপত্তার চাবিকাঠি চিরকাল ইসরায়েলের হাতেই থাকতে হবে।"
এই নতুন নীলনকশাটি এমন এক সময়ে এলো যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ‘বোর্ড অফ পিস’ (Board of Peace)-এর মাধ্যমে গাজাকে একটি অসামরিকীকৃত টেকনোক্র্যাট শাসনের অধীনে আনার প্রস্তাব করছে। ইসরায়েলের এই একক সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘টু-স্টেট’ বা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) এবং হামাস উভয়ই এই পরিকল্পনাকে ‘প্রকাশ্য দখলদারি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। কাতার এবং মিশরের মধ্যস্থতাকারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, এই নতুন নকশা ভবিষ্যতে যেকোনো যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে অনিশ্চিত করে তুলবে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেট ও হারেৎজ জানিয়েছে, নতুন পদক্ষেপগুলোর মধ্যে পশ্চিম তীরে ইহুদি ব্যক্তিদের জমি কেনার ওপর থাকা বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি কিছু ধর্মীয় স্থানের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের হাতে নেওয়া এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম বলেন, ১৯৬৭ সালে পশ্চিম তীর দখলের পর এটি ইসরায়েলের সবচেয়ে বিপজ্জনক ও গুরুতর সংযুক্তিকরণের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, এই নিয়ম অনুযায়ী ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ব্যক্তিগতভাবে জমির মালিক হতে পারবেন।
ইব্রাহিম জানান, ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক আইনে দখলদার শক্তির নিজ নাগরিকদের দখলকৃত ভূখণ্ডে বসবাস নিষিদ্ধ। তবুও নতুন সিদ্ধান্তের ফলে রামাল্লার মতো শহরের কেন্দ্রেও বসতিস্থাপনকারীদের ঘর নির্মাণে কার্যত কোনো বাধা থাকছে না।
ফিলিস্তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হুসেইন আল-শেখ বলেন, পশ্চিম তীরে সংযুক্তিকরণ জোরদারের এসব পদক্ষেপ সব ধরনের স্বাক্ষরিত ও বাধ্যতামূলক চুক্তির লঙ্ঘন। এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও পরিপন্থি। তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব একতরফা সিদ্ধান্ত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা ধ্বংস করে দেবে এবং পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেবে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিকল্পনাটি কেবল একটি সামরিক কৌশল নয়, বরং এটি গাজার জনসংখ্যার ভৌগোলিক বিন্যাস চিরতরে বদলে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।