প্রকাশিত:
গতকাল

উন্নত জীবনের আশায় উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপ পৌঁছানোর স্বপ্ন আবারও বিষাদে রূপ নিল। লিবিয়ার জুওয়ারা উপকূলের কাছে একটি অভিবাসীবাহী রাবার বোট ডুবে অন্তত ৫৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। উদ্ধারকারী দলগুলো একে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় নৌকাডুবি হিসেবে বর্ণনা করেছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ২ জন শিশু এবং বেশ কয়েকজন নারী রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে আইওএম।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
আইওএম-এর তথ্যানুযায়ী, গত ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে লিবিয়ার আল-জাওইয়া উপকূল থেকে নৌকাটি ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়। জরাজীর্ণ রাবার বোটটিতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী বোঝাই করা হয়েছিল। যাত্রা শুরু করার প্রায় ৬ ঘণ্টা পর সমুদ্রের মাঝপথে নৌকাটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় এবং প্রবল ঢেউয়ের তোড়ে তা উল্টে যায়।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে মাত্র ২ জন নাইজেরিয়ান নারীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় জেলেরা তাদের ভাসমান অবস্থায় দেখতে পেয়ে তীরে নিয়ে আসে। উদ্ধার হওয়া এক নারী কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, তার চোখের সামনেই তার দুই সন্তান এবং স্বামী সাগরের গভীরে তলিয়ে গেছে। বর্তমানে তারা আইওএম-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
আইওএমের বরাতে জানা গেছে, জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, নৌকাটিতে বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের শরণার্থী ও অভিবাসীরা ছিলেন। নৌকাটি ৫ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১১টার দিকে উত্তর-পশ্চিম লিবিয়ার আল-জাওইয়া এলাকা থেকে যাত্রা শুরু করে এবং প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সাগরে ডুবে যায়।
নিহতদের বেশিরভাগই সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোর (যেমন নাইজেরিয়া, গাম্বিয়া ও ইরিত্রিয়া) নাগরিক বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উদ্ধারকারীরা আশঙ্কা করছেন, এই নৌকায় কয়েকজন এশীয় নাগরিকও থাকতে পারেন। এখন পর্যন্ত কোনো মৃতদেহ উদ্ধার করা যায়নি; নিখোঁজ ৫৩ জনকেই মৃত বলে ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
আইওএমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শুধু জানুয়ারি মাসেই চরম আবহাওয়ার মধ্যে সেন্ট্রাল মেডিটেরানিয়ানে একাধিক ‘অদৃশ্য’ নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৩৭৫ জন অভিবাসী মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে, কারণ অনেক মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্তই হয়নি।
আইওএম-এর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, "এই মৃত্যুগুলো প্রতিরোধযোগ্য ছিল। সমুদ্রপথে কার্যকর উদ্ধার অভিযান এবং অভিবাসীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথের ব্যবস্থা না থাকায় বারবার এমন করুণ দৃশ্য আমাদের দেখতে হচ্ছে।" তারা লিবিয়া উপকূল এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় টহল ও অনুসন্ধান কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, এসব বারবার ঘটতে থাকা দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে শরণার্থী ও অভিবাসীরা এখনও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
যুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন থেকে বাঁচতে মানুষ এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির মারপ্যাঁচে এবং উন্নত দেশগুলোর কড়া সীমান্তে মাঝ সমুদ্রে এই মানুষগুলো কেবল সংখ্যা হয়েই হারিয়ে যাচ্ছে।