প্রকাশিত:
গতকাল

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রমজান এসে গেছে। ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বসস্তুপের মধ্যে থেকেও পবিত্র এ মাসকে স্বাগত জানাতে হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। তাদের একজন মধ্য গাজার বুরেজ শরণার্থী শিবিরের মাইসুন আল-বারবারাউই। তিনি তার তাঁবুতে ইসলামের রমজানকে স্বাগত জানিয়েছেন। জীর্ণ ছাদ থেকে ঝুলছে সাধারণ কিছু সাজসজ্জা, আর কাপড়ের দেয়ালে রঙিন সব আঁকিবুকি—পবিত্র মাসের আগমন উপলক্ষে শিবিরের বাসিন্দারাই এসব তৈরি করেছেন।
চারদিকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, ধুলিকণায় মিশে যাওয়া মসজিদ আর প্রিয়জন হারানোর তীব্র হাহাকার—এই নরকীয় ধ্বংসস্তূপের মাঝেই উপস্থিত হয়েছে রহমতের মাস রমজান। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় এবার নেই কোনো উৎসবের আমেজ, নেই কোনো আলোকসজ্জা। তবুও ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়েই গাজাবাসী বরণ করে নিচ্ছেন তাদের সবথেকে পবিত্র এই মাসটিকে।
ইসরায়েলি হামলায় গাজার অধিকাংশ মসজিদ এখন মাটির সাথে মিশে গেছে। কিন্তু সেই ধ্বংসাবশেষের ওপরেই চাদর বিছিয়ে জামাতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা। খোলা আকাশের নিচে, ভাঙা মিনারকে সাক্ষী রেখে শত শত গাজাবাসী তারাবিহ’র নামাজ আদায় করছেন। তাদের মতে, "মসজিদ ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু ইবাদতের ইচ্ছা নয়।"
রমজানের চিরচেনা ইফতার বা সেহরির তৃপ্তি গাজাবাসীর জন্য এখন এক অলীক কল্পনা। গত কয়েকমাস ধরে গাজাবাসীর জীবন কাটছে চরম অনাহারে। ফলে তাদের জন্য রোজা কেবল ধর্মীয় বিধান নয়, বরং প্রতিদিনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।সেহরিতে এক টুকরো রুটি বা ইফতারে এক গ্লাস পরিষ্কার পানি পাওয়াও এখন ভাগ্যের ব্যাপার। ত্রাণের অপেক্ষায় থাকা লাখো মানুষ এখন ঘাস বা পশুখাদ্য খেয়ে জীবন ধারণ করছেন।
এত কষ্টের মাঝেও শিশুদের মনে রমজানের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে কিছু পরিবার ধ্বংসস্তূপের ওপর ছোট ছোট রঙিন ফানুস (Fanous) ঝুলিয়েছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা শিশুদের মন থেকে মুছে দিতে অভিভাবকরা চেষ্টা করছেন রমজানের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে। ধুলোমাখা মুখে ছোট ছোট শিশুদের কুরআন তেলাওয়াত গাজার বাতাসে এক অনন্য আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করেছে।
রাফাহ থেকে শুরু করে গাজা সিটি—প্রতিটি জায়গার দৃশ্য একই। ইসরায়েলি বাহিনীর ক্রমাগত হামলার হুমকির মুখেই গাজাবাসী বলছেন, "আমরা আজীবনই রোজাদার। এই রমজান আমাদের ধৈর্যের চূড়ান্ত পরীক্ষা। আমরা এই ধ্বংসস্তূপেই সেজদা দেব এবং এখান থেকেই আল্লাহর কাছে মুক্তি প্রার্থনা করব।"
গাজার রমজান আজ পুরো বিশ্বের জন্য এক নীরব প্রতিবাদ। যখন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে মানুষ ইফতারের টেবিলে বিলাসিতা করে, তখন গাজার মানুষ এক ফোঁটা পানির জন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাদের এই ইবাদত প্রমাণ করে যে, কামানের গোলা দিয়ে মানুষের ঘর ভাঙা গেলেও তাদের আত্মিক শক্তিকে হারানো অসম্ভব।
গাজার মানুষের এই ধৈর্য ও ত্যাগ কেবল একটি সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং পুরো মানবতার জন্যই এক বিশাল শিক্ষা।